মোবাইল ফোন কি? মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুফল ও কুফল

আধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যার বহুল পরিচিত একটি আবিষ্কার হচ্ছে "মোবাইল" ফোন । বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোনের সাথে পরিচিত নেই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া খুবই মুশকিল । যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম একটি হাতিয়ার হচ্ছে "মোবাইল ফোন" । এর আবিষ্কারের ফলে অতীতের মত বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজনের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাদের উত্তরের আশায় আর বসে থাকতে হয় না।
মোবাইল ফোন কি?
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এখন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মানুষের সাথে মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে । এটি আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে । বর্তমানে মোবাইল ফোন ছাড়া আমরা এখন এক মুহূর্ত চিন্তা করতে পারি না। চলুন তাহলে মোবাইল সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেই।

মোবাইল ফোন কি

মোবাইল ফোন হল একটি “তারবিহীন টেলিফোন বিশেষ” । অনেকে আবার এটিকে সেলফোন , সেলুলার ফোন , হ্যান্ডফোন বা মুঠোফোন নামে সম্বোধন করে । মোবাইল শব্দটির অর্থ হলো “ভ্রাম্যমান”  বা “স্থানান্তরযোগ্য” । এটি খুব সহজেই একই স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করা যায় এবং ব্যবহার করা যায় বলে এটিকে “মোবাইল ফোন” নামকরণ করা হয়েছে।


এখন প্রশ্ন জাগে যার তার নেই সেটি আবার কিভাবে যোগাযোগ  করবে ? উত্তর - মোবাইল ফোন বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে যোগাযোগ  করে । যার ফলে এটিকে একটি বড় ভৌগোলিক এলাকায়    নীরবচ্ছিন্নভাবে সংযোগ দিতে হয় । বর্তমানে আধুনিক ফোন দিয়ে  শুধু কথা বলাই নয় বরং আরো অনেক সেবা পাওয়া যায় । যেমন - ই-মেইল সেবা , ইন্টারনেট সেবা , এসএমএস বা টেক্সট সেবা ,    এমএমএস সেবা , ব্ল-টুথ সেবা , ক্যামেরা , গেমিং ইত্যাদি ।


আধুনিক মোবাইল ফোন এসব সেবা দেয় এবং কম্পিউটারের সাধারণ কিছু সুবিধা প্রদান করে বলে এটিকে স্মার্টফোন নামে ডাকা হয় ।

মোবাইল ফোনের ইতিহাস

ইঞ্জিনিয়ার “মার্টিন কুপার” প্রথম মোবাইল ফোন তৈরি করেন ১৯৭৩ সালে , আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে । এজন্য তাকে মোবাইল ফোনের জনক বলা হয় । তিনি আমেরিকার ছোট একটি টেলিকম কোম্পানির MOTOROLA তে কাজ করতেন ।

তার মাথায় প্রথম মোবাইল ফোন তৈরি চিন্তা এসেছিল আমেরিকার একটি কমিটির Dick Tracy এর মাধ্যমে । যেখানে কর্মকর্তারা রেডিও এর সাহায্যে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করতেন । তারপর মার্টিন কুপার এর নেতৃত্বে ২০ থেকে ৩০ জনের একটি দল মোবাইল ফোন তৈরি করেছিল মাত্র ৩০ দিনে । তার নেতৃত্বে তৈরিকৃত মোবাইল ফোনটি লম্বায় ছিল ১০ ইঞ্চি , চওড়ায় ছিল 2 ইঞ্চি , এবং উঁচু ছিল ৪ ইঞ্চি । যার ওজন ছিল প্রায়  এক কিলোরও বেশি । তার তৈরিকৃত মোবাইল ফোনটি দিয়ে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট কথা বলা যেত । তারপর তার ব্যাটারি শেষ হয়ে যেত । 

আরও পড়ুনঃ কম্পিউটারের সকল যন্ত্রাংশের নাম ও পরিচিতি

এইজন্য তার ফোনটি দেখে অনেকে হাসাহাসি করেছিল । তবে সত্যিকার অর্থে সেই সময় এরকম একটি মোবাইল ফোন তৈরি করা ছিল এক ধরনের অসম্ভব চ্যালেঞ্জ । পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম মোবাইল কলটিও করেছিলেন মার্টিন কুপার তার এক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুকে যিনি Atandt কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন । Atandt কোম্পানি ছিল সেই সময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেলিকম কোম্পানি । যারা সেলুলিস টেকনোলজি সম্পন্ন একটি মোবাইল ফোন আবিষ্কার করে যেটি হাতে নিয়ে ঘোরার কথা তারা চিন্তাও করেনি । তারা মূলত গাড়িতে টেলিসংযোগ দেওয়ার জন্য এটি তৈরি করেছিল । 

তারপর ১৯৮৩ সালে প্রথমবারের মতোন MOTOROLA Dynatac 8000x ফোনটি বাজারে আসে । যার দাম ছিল প্রায় চার হাজার ডলার । সেই সময় ফোনটি কারো কাছে ইটের মত আবার কারো কাছে জুতার মতো দেখতে মনে হয়েছিল । 

কিন্তু কে জানত সেই মোবাইল ফোনটি এখন আমাদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে দাঁড়াবে । বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ৮৭ শতাংশেরও বেশি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে । এবং নিয়মিত ব্যবহার করে প্রায়  ৫১১ কোটিরও বেশি মানুষ ।

মোবাইল ফোনের জনপ্রিয়তার কারণ

মোবাইল ফোনের জনপ্রিয়তার অনেকগুলো কারণ আছে যার মধ্যে বিশেষ কিছু কারণ নিচে ‍দেওয়া হলোঃ

প্রথমতঃ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আমরা খুব দ্রুত যোগাযোগ সম্পন্ন করতে পারি এবং এটি স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায় বলে সব ধরনের মানুষ এটি ব্যবহার করতে পারে । 

দ্বিতীয়তঃ মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে সর্বত্র যাওয়া যায় এবং অতি সহজে এটি সব জায়গায় ব্যবহার করা যায় । 

তৃতীয়তঃ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আমরা খুব কম খরচে যে কোন সংবাদ এস-এম-এস এর মাধ্যমে আমাদের আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবের কাছে পৌঁছে দিতে পারি । 

চতুর্থতঃ সাধারণত ল্যান্ডলাইন ফোনে প্রচুর টাকা বিল আসে কিন্তু মোবাইলের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটে না । তাছাড়া পুলিশের সব ধরনের তদন্তের কাজে মোবাইল ফোন একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে । 

পঞ্চমতঃ বর্তমানে বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ-খবর ,  প্রাত্যহিক খবর , এফএম রেডিও , ক্যামেরা ইত্যাদি সকল বিষয় মোবাইল বা স্মার্টফোন থেকে পাওয়া যায় । তাছাড়া মোবাইল ফোন শুধু আমাদের প্রয়োজনই মেটায় না , এটি বর্তমানে আমাদের একটি বিনোদনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে । 

মোবাইল ফোনের হোয়াটঅ্যাপ এর মাধ্যমে আমরা খুব কম সময়ে বিভিন্ন ছবি , খবর , অফিস-আদালতের সার্কুলার ইত্যাদি বিষয় শেয়ার করতে পারি ইত্যাদি। তাছাড়া আরো অনেক বিষয়ে এই ব্যবস্থাটি আজকের দিনে খুবই কার্যকারী ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুফল ও কুফল 

মোবাইল ফোন আবিষ্কারের পর থেকে পৃথিবী যেন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে । মোবাইল ফোন এখন আমাদের জীবনের একটি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস হয়ে দাঁড়িয়েছে । যেহেতু মোবাইল ফোন আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ । চলুন তাহলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের কিছু সুফল ও কুফল জেনে নেই-

মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুফল

১। যোগাযোগঃ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সহজে যোগাযোগ করা যায়।

২। ছোট ও সুুবিধাজনকঃ মোবাইল ফোন ছোট হয় এটি সব জায়গায় সহজে বহন করা যায়।

৩। টেক্সটিংঃ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আমরা স্বল্প খরচে এসএমএস এমএমএস ইমেইল ইত্যাদির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারি।

৪। ফটো ও ভিডিওঃ মোবাইলের মাধ্যমে আমরা ছবি তোলা ভিডিও করা ইত্যাদি কাজ  করতে পারি।

৫। অনলাইন ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সঃ এটি ব্যবহার করে আমরা আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চেক করতে পারি। বিভিন্ন হিসাব ক্যালকুলেশন লরতে পারি। 

৬। শিক্ষাঃ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আমরা বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপ ডাউনলোড করে  উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারি।এছাড়াও ইন্টারনেট ব্যবহার করে ঘরে বসে আমরা বিভিন্ন দেশের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। 

৭। বিনোদনঃ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আমরা আমাদের বিরক্তিকর সময় গুলো বিভিন্ন নাটক সিনেমা গল্প গেমিং ইত্যাদি করে পার করতে পারি।

৮। জরুরী অবস্থাঃ জরুরী  অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আমরা ফায়ার সার্ভিস হসপিটাল পুলিশ ইত্যাদি জায়গায় কল করতে পারি।

মোবাইল ফোন ব্যবহারের কুফল 

১। মস্তিকের ক্যান্সারঃ মোবাইল ফোন যেহেতু রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে শক্তি নির্গত করে তাই এটি অতিরিক্ত ব্যবহারে মস্তিষ্কে ক্যান্সার হতে পারে।

২। চোখ ও দৃষ্টির সমস্যাঃ মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে যে আলো নির্গত হয় তা আমাদের চোখের জন্য খুবই ক্ষতিকর। যদি আমরা একটানা পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা মোবাইল ফোন টিপাটিপি করি তাহলে আমাদের চোখের সমস্যা হতে পারে।

৩। ঘুমকে বাধা দেয়ঃ বেশিরভাগ মানুষই রাতে মোবাইলে বিভিন্ন ভিডিও গেমিং মেসেজিং ইত্যাদি করে থাকে। যার ফলে তার রাতে ঘুম হারাম হয়ে যায়।

৪। যুব সমাজ ধ্বংস করাঃ বেশিরভাগ যুবকই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বিভিন্ন অনৈতিক কাজ যেমন চুরি ডাকাতি পর্ন দেখায় ইত্যাদি করে থাকে। যার ফলে যুব সমাজ ধ্বংস হতে পারে।

৫। নোমোফোবিয়াঃ অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে আমাদের নোমোফোবিয়া হতে পারে।

আমরা সবাই জানি সব জিনিসেরই সুবিধা ও ‍অসুবিধা , ভালো ও মন্দ দিক  রয়েছে । আমরা সবাই চেষ্টা করব সব জিনিসের ভালো দিকগুলো ব্যবহার করার আর খারাপ দিকগুলো ত্যাগ করার । 

Share this post with your friends

See previous post See Next Post
No one has commented on this post yet
Click here to comment

Please comment according to Blogger Mamun website policy. Every comment is reviewed.

comment url